না বলা কথা

  • মূল পাতা
  • Bangla issue?
  • আমরা কারা

আগুনে তেল ঢালা

তারিখ July 8th, 2008
ব্লগার সুবিনয় মুস্তফী বিষয় অনিশ্চিত

এই লেখাটা কিছুদিন আগে লেখা, তবে এখনো প্রাসঙ্গিক। এর একটি ‘পরিশোধিত’ সংস্করণ প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট খাদ্যদ্রব্যের বেপরোয়া মূল্যবৃদ্ধি। গত এক বছরে এই মূল্যস্ফীতি প্রকট আকার ধারণ করেছে, এবং দেশে দেশে তা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। অপর যে সংকট - জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধি – তা গত তিন-চার বছর ধরেই পরিলক্ষিত হচ্ছিল। কিন্তু নানান কারনে সেটা ২০০৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এসে ক্রাইসিসে পরিণত হয়েছে।

গত শুক্রবার এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ১২৯ ডলার থেকে ১৩৯ ডলারে উঠে যায়। এই হঠাৎ অবনতি বিশেষজ্ঞদের একেবারে কাঁপিয়ে দিয়েছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তেলের বাজারে নিয়ম ছিল ছোট মাপের ওঠা-নামা – দৈনিক কয়েক সেন্ট করে দাম বাড়তো অথবা কমতো। সেই বাজারে একদিনে ১০ ডলারের মূল্যবৃদ্ধি একটা বিশাল ধাক্কা বৈকি।

কিছুটা পেছনে ফিরে তাকাই। নীচের তালিকা থেকে তেলের দামের ক্রমশ বৃদ্ধি সম্পর্কে আন্দাজ পাবেন -

(সারণী)

এক ব্যারেল ক্রুড অয়েলের বছর-শেষ দাম -

২০০৩ – ৩০ ডলার

২০০৪ – ৪০ ডলার (পুরো বছরে ১০ ডলারের বৃদ্ধি)

২০০৫ - ৫৬ ডলার (১৬ ডলার বৃদ্ধি)

২০০৬ – ৫৯ ডলার (৩ ডলার বৃদ্ধি)

২০০৭ – ৯৪ ডলার (৩৫ ডলার বৃদ্ধি)

২০০৮ জুন – ১৩৯ ডলার (৬ মাসে ৪৫ ডলার বৃদ্ধি)

বাজার যে ভেঙ্গে পড়ছে, সেটা বোঝানোর জন্যে এই সারণীটুকুই যথেষ্ঠ। পুরো বছরে যেখানে তেলের দাম ১০ ডলার উঠতো, সেখানে একদিন-একরাতের মধ্যে দাম একই পরিমান উঠে যাচ্ছে। এটা কিভাবে সম্ভব? এটা কি স্বাভাবিক বা স্বতস্ফূর্ত? নাকি এখানে অন্য কিছু কাজ করছে? এর উত্তর খোঁজার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চাহিদা যোগান নিয়ে একটু আলাপ করা যাক।

উন্নয়নশীল বিশ্বে ক্রমবর্ধমান চাহিদা

শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে তেলের দাম বাড়ার পেছনে কিছু ন্যায্য কারণ আছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ দুটি দেশ চীন ও ভারত। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশই হয় ভারত নয় চীনের নাগরিক। সাম্প্রতিককালে এই দুটো দেশেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ভীষণভাবে বেড়েছে – গড়পরতা ৯-১১%। ইউরোপের সাথে তুলনায় এই প্রবৃদ্ধির হার পাঁচগুণ বেশি, আর আমেরিকার অর্থনীতির তুলনায় প্রায় তিনগুণ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি অন্যতম প্রধাণ চালিকাশক্তি হলো জ্বালানী অথবা তেল। শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে বাস-ট্রাক-গাড়ি চালাতে প্রয়োজন হয় জ্বালানীর। পৃথিবীর বৃহত্তম দুটো দেশ যদি তড়িৎ গতিতে প্রবৃদ্ধি লাভ করে, তাহলে তাদের জ্বালানীর চাহিদাও বাড়তে বাধ্য। উদাহরণ দেই – চীনা সরকারের হিসাব মতে ২০০৬ সালে চীনের অভ্যন্তরীণ তেলের চাহিদা ছিল ৩৫ কোটি টন। ২০১০ সালে তা গিয়ে দাঁড়াবে ৪০ কোটি টনে, আর ২০২০ সালে ৫৬ কোটি টনে।

চীন ও ভারত ছাড়াও এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলো গত ৫ বছরে ভালো প্রবৃদ্ধির হার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন – এগুলো হলো কর্মসংস্থানের উৎস, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের একটি চাবিকাঠি। কিন্তু দ্রুত প্রবৃদ্ধির অপর পিঠ হচ্ছে তেল এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডারের উপর চাপ সৃষ্টি।

তেলের ভান্ডার কি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে?

এই প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডারের দিকে একটু নজর ফেরাই। জ্বালানী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা বিশ্বাস করেন পৃথিবীর তেলের ভান্ডার ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে আসছে। এই তত্ত্বের নাম দেয়া হয়েছে পীক অয়েল থিওরি (peak oil theory)। প্রমাণ হিসাবে এই বিশেষজ্ঞরা আমাদের নজর আকর্ষণ করেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেলের খনিগুলোর দিকে। কি হচ্ছে সেগুলোর ভেতরে?

আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর টপ ফাইভ তেলখনির মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের গাওয়ার খনি, কুয়েতের বুর্গান খনি, এবং মেক্সিকোর ক্যান্টারেল খনি। আশংকার বিষয় হচ্ছে যে তিনটি খনিরই দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি যেই তেল ছিল, তা উত্তোলন করা প্রায় শেষ। এই খনিগুলোর ভেতরে এখনো কোটি কোটি ব্যারেল তেল রয়ে গেছে। কিন্তু সেই তেল হলো ভূগর্ভের আরো অভ্যন্তরে, প্রতি বছরই তা গভীর থেকে আরো গভীরে চলে যাচ্ছে। উত্তোলন করা আরো কষ্টসাপেক্ষ হয়ে পড়ছে, তেল উত্তোলনের খরচও ক্রমশ বাড়ছে।

আরো কাহিনী আছে। কথা উঠেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশ্ববাজারকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে তাদের তেলের খনির ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছে। যত না তেল আছে, তার থেকে বেশী দাবী করছে তারা। অপরদিকে আশার কথা হলো যে ২০০৭ সালে ব্রাজিলের উপকূলে আবিষ্কার হয়েছে বেশ কিছু বড় বড় তেলের খনি। কিন্তু সেগুলো থেকে বাণিজ্যিকভাবে তেল উত্তোলন করা এখনো শুরু হয়নি। এবং শুরু হতেও বেশ কয়েক বছর লাগবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

তেলের বড় উৎপাদক দেশ নাইজেরিয়া ও ভেনেজুয়েলা সম্পর্কেও কিছু বলা যায়। অঢেল তেল-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নাইজেরিয়ার সাধারণ জনগণ গত ৩০-৪০ বছরে এর কোন সুফল দেখেনি। বরং দেশটি দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছে, নাইজেরীয়দের জীবনযাত্রার মান ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। এর প্রতিবাদে সে দেশে কয়েক বছর ধরেই তেল উত্তোলনকারী বিদেশী কম্পানীগুলোর বিরুদ্ধে চাপা অসন্তোষ ঘণীভূত হচ্ছে। সেই অসন্তোষ মাঝে মাঝে প্রকাশ পায় - তেলের পাইপের উপর হামলা হয়, তেল কম্পানীর কর্মীরাও কখনো কখনো কিডন্যাপ হন। আর দুনিয়ার অপর কোনায় রয়েছে আরেক তেল-সমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলা। তার নেতা হুগো চাভেজ-এর সাথে পশ্চিমা বিশ্বের তেমন কোন সুসম্পর্ক নেই। এইসব কারনেও তেলের দাম কিছুটা ওঠা-নামা করতে পারে।

পশ্চিমা বিশ্বের যথেচ্ছ জ্বালানী ব্যবহার

এর পরে দেখা যাক উন্নত বিশ্বের কান্ড। পশ্চিমা বিশ্বে উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ জীবনযাত্রার বিন্যাস, সব কিছুই অত্যন্ত ব্যয়বহুল, জ্বালানী শক্তি খরচের দিক থেকে চিন্তা করলে। মাথাপিছু হিসাব কষে বিষয়টি আরো পরিষ্কার করা যায়। দেখা গেছে যে গড়ে উন্নত বিশ্বের প্রতিটি নাগরিক যতখানি জ্বালানী শক্তি খরচ করেন এক বছরে, সেটা অনুন্নত বিশ্বের মাথাপিছু জ্বালানী ব্যবহারের প্রায় পাঁচগুণ। (ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইন্সটিটিউটের ২০০৩ সালের হিসাব অনুযায়ী)।

এটা তো গড় হিসাব। দুটো দেশকে বেছে নিয়ে মাথাপিছু তুলনা করলে হিসাব আরো চমকপ্রদ। ধরুন, বাংলাদেশ এবং আমেরিকার তুলনা করি। এখানে উল্লেখ্য যে মাথাপিছু জ্বালানী ব্যবহারের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান একেবারেই নীচের দিকে। এমনকি হাইতি বা কঙ্গোর থেকেও আমরা পিছিয়ে আছি। অপর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিকের বাৎসরিক শক্তি চাহিদা আমাদের মাথাপিছু চাহিদার প্রায় ৫০ গুণ বেশী।

শক্তি ব্যবহারের প্রসঙ্গে একটি বহুল আলোচিত তথ্য আছে, পাঠকদের কাছে সেটাও আরেকবার পরিবেশন করা যায়। সমগ্র বিশ্বের জনসংখ্যার মোট ৫% আমেরিকাতে বসবাস করে। অথচ বিশ্বের ২৫% শক্তি ব্যবহার করছে তারা। অর্থাৎ জ্বালানী শক্তি খরচের মাপকাঠিতে তাদের জীবনযাত্রা কেবল ব্যয়বহুলই নয়, একেবারে বিলাসবহুল।

এর পেছনে বহু কারনই আছে। তবে সবচেয়ে দৃশ্যমান কারন হচ্ছে মার্কিনীদের চরম গাড়ি-প্রীতি। প্রতিটি মার্কিন পরিবারের কমপক্ষে একটি, অনেক ক্ষেত্রে দুটো করে গাড়ি রয়েছে। আরেকটি ছোট তথ্য - প্রতি হাজার জনে মার্কিনীরা ৮০০টি গাড়ি চালায়। অথচ বাংলাদেশে সেই সংখ্যা হচ্ছে প্রতি হাজার জন মানুষের জন্যে মাত্র দুটো করে গাড়ি!

এই রকম আরো অনেক ছোট বড় বহু উদাহরণ থেকে এতোটুকু আমাদের কাছে পরিষ্কার হয় যে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এত অতিরিক্ত হারে জ্বালানী খরচ করছে যে সেটা দীর্ঘমেয়াদী বিচারে জ্বালানী সংকট সৃষ্টি করতে বাধ্য।

ডলারের পতন এবং জ্বালানী-জুয়াড়িদের কারবার

তবে সত্যি কথা বলতে পশ্চিমাদের এই যথেচ্ছ জ্বালানী ব্যবহার তো নতুন কিছু নয়। কমপক্ষে গত ১০০ বছর ধরে এই ব্যবস্থা চালু আছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে আজ এই ২০০৮ সালে এসে তেলের দাম এমন বল্গাহীন বেগে কেন ছুটতে আরম্ভ করলো?

বিশেষজ্ঞরা আরো দুটি কারন খুঁজ়ে পেয়েছেন এর পেছনে। কারন দুটি একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। প্রথমটি হলো সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে ডলারের পতন। গত এক বছর যাবত মার্কিন অর্থনীতি বেশ টালমাটাল অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। মন্দা কেবল এলো এলো বলে। এর ফলে বাজারে মার্কিনদের মুদ্রা অর্থাৎ ডলারের আকর্ষণও কমে গেছে। বড় মাপের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ডলারের এই পতনে বেশ বিমর্ষ – কেন না তাদের স্টক-শেয়ার-বন্ড অনেক কিছুই ডলারে মাপা। ডলারের দাম পড়ে গেলে তাদের এইসব স্টক শেয়ার বন্ড-এর মূল্যও পড়ে যায়।

এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে অনেক আন্তর্জাতিক কারবারী (পরিভাষায় স্পেকুলেটার) এখন তেলের বাজারে তাদের টাকা ঢালছেন। এই বিষয়ে বৃটেনের নামকরা অর্থনীতিবিদ মেঘনাদ দেশাই (ইনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত) একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা দিয়েছেন। ফাইনানশিয়াল টাইমস পত্রিকায় এই রচনাটি প্রকাশিত হয় গত সপ্তাহে। দেশাই তেলের দাম অতিরিক্ত বাড়ার পেছনে সরাসরি এই কারবারীদের দায়ী করেছেন।

কারবারীদের বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র হলো নিউ ইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জ – সংক্ষেপে নাইমেক্স। স্টক এক্সচেঞ্জে যেমন স্টকের কারবার হয়, নাইমেক্সে তেমন তেলের কন্ট্রাক্ট বেঁচা-কেনা হয়। দেশাই দেখিয়েছেন যে মাত্র ৫ বছর আগেও তেলের বাজারে এইসব কারবারীদের মোট বিনিয়োগ ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলারের মতো। কিন্তু আজ সেই বিনিয়োগ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৬০ বিলিয়ন ডলারে!

এত টাকা কোত্থেকে এলো, কেনই বা এলো? দেশাই বলছেন যে ডলারের বাজার থেকে পালিয়ে এই কারবারীরা এখন তেলের বাজারে ঢুকেছেন অনেকটা হুজুগের বশবর্তী হয়ে। ভবিষ্যতে তেলের দাম আরো বাড়বে, এই আশায় কারবারীরা আগুনে আরো নতুন ঘি ঢেলে যাচ্ছেন।

এই হুজুগ বিষয়টি পরিষ্কার করতে আমাদের স্টক মার্কেট বিপর্যয়ের সাথে তুলনা টানা যেতে পারে। ৯৬ সালে ঢাকা শেয়ার বাজারে স্টকের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। দাম কেবল বেড়েই যাবে, এই আশায় অনেক সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চয় করা টাকা শেয়ার বাজারে খাটিয়েছিল। বাড়তি এই টাকার অনুপ্রবেশের ফলে শেয়ারের দাম আরো বেড়ে গিয়েছিল। (যদিও সেই শেয়ার বুদবুদ চিরস্থায়ী হয়নি, কিছুদিন পরে স্টক মার্কেটের পতন হয়েছিল।)

তেলের বাজারেও অনেকটা এই রকম হুজুগ কাজ করছে। তবে এইবার বিনিয়োগকারীরা সাধারণ মানুষ নয়, বরং আন্তর্জাতিক কারবারীর দল, বলা যায় জুয়াড়ীর দল। তারাই দাম ঠেলে ঠেলে বাড়াচ্ছে। তেলের চাহিদা-যোগানের কারন তো কিছু ছিলোই – যেগুলো উপরে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু দাম যতখানি বেড়েছে, তার সাথে চাহিদা-যোগানের অন্তর্নিহিত কারনগুলোর সম্পর্ক ক্ষীণ। চীন বা আমেরিকা বা নাইজেরিয়ার থেকেও বড় দোষী এখানে কারবারীরা। একদিনে ১০ ডলার মূল্যবৃদ্ধি তাদের তৎপরতারই ফলাফল।

মেঘনাদ দেশাই তাই নীতি নির্ধারকদের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন যে অবিলম্বে কারবারীদের উপরে নিয়মনীতি আরো কঠোর করা হোক। এদের কর্মকান্ডে কিছু রদবদল করা না গেলে তেলের বাজারে দামের বুদবুদ আরো ফুলতে থাকবে। এবং সেটা হয়ে দাঁড়াবে বিশ্বব্যাপী মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের কারন। ইতিমধ্যে দেশে দেশে দাঙ্গা-নৈরাশ্য ছড়িয়ে পড়ছে। গরীবের পেটে গিয়ে পড়ছে লাথি।

এমনকি খোদ আমেরিকার গাড়ি-প্রেমিক জনগণও আর এত টাকার তেল কিনে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। পাঁচ বছর আগে পেট্রোল পাম্পে এক গ্যালন পেট্রোলের দাম ছিল এক ডলারের আশে পাশে। সেই একই পাম্পের তেলের দাম আজকে ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।

মার্কিনদের প্রচুর দায়ভার আছে জ্বালানী ব্যবহারের ক্ষেত্রে। মার্কিন সরকার অনেকগুলো দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিতে আজ পর্যন্ত গাফিলতি করেছে যার ফলে তাদের তেলের চাহিদা দিন কে দিন কেবল বেড়েই চলেছে। ট্রেন-বাস সহ অন্যান্য গণপরিবহন মাধ্যমকে তারা বিমাতাসুলভ চোখে দেখেছে। রেললাইন না বসিয়ে গাড়ি চলাচলের সুবিধার জন্যে চওড়া হাইওয়ে তৈরী করে দিয়েছে। গাড়ির গ্যালন-প্রতি মাইলেজ বাড়ানোর জন্যে কোন নিয়মনীতি বসানো হয়নি। তাই তেল অপচয় করে, এমন কম মাইলেজের গাড়ী নির্মান হয়েছে অনেক বেশী। অন্যান্য উন্নত দেশে যেমন ইউরোপে পরিবহণ পেট্রোলের উপর বিরাট কর ধার্য করা হয়, যাতে তেলের ব্যবহার কমানো যায়। আমেরিকাতে সেই চেষ্টাও করা হয়নি।

এই রকম করে মার্কিন সরকার ও মার্কিন সমাজের গোটা বিশেক ভূল সনাক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞ ব্যারি রিটহোল্টস। ভবিষ্যতে চলতে গেলে এই ভূলগুলো নিরাময় করা আবশ্যক। মার্কিন সরকারের জন্যে এগুলো হবে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প। রেল-ট্রাম বসানো, নতুন কর আরোপ করা, অল্টারনেটিভ জ্বালানীর পেছনে গবেষণা – এই সবগুলো কার্যকরী করতে ১-২ বছর থেকে শুরু করে এক দশক পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

তবে স্বল্পমেয়াদী ব্যবস্থা যেগুলো আছে, তার মধ্যে স্পেকুলেটার আর জুয়াড়ীদের হাত থেকে তেলের বাজারকে রক্ষা করা জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানীর দামের জ্বালায় জর্জরিত বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের খাতিরে পাশ্চাত্যের অর্থনীতির হর্তাকর্তারা এই আশু পদক্ষেপগুলো নিবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

মন্তব্য নেই

ঢাকার নগর পরিকল্পনাঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা-৫

তারিখ July 7th, 2008
ব্লগার তানভীর ইসলাম বিষয় অনিশ্চিত
তানভীর ইসলাম

শহরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ, সিটি ম্যানেজার নিয়োগ ও সিস্টার সিটি কনসেপ্ট

নাগরিক সম্পৃক্ততা বা জনগণের অংশগ্রহণ (public participation) আধুনিক নগর পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও আমাদের দেশে বরাবরই তা উপেক্ষিত থেকেছে। যারা শহরের নাগরিক তাদের মতামতের কোন মূল্য ছাড়াই এখানে বিচ্ছিন্নভাবে পরিকল্পনা করা হয়। নগর পরিকল্পনায় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার সবচেয়ে বড় সুযোগ থাকে শহরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (Goals and objectives) নির্ধারণে এবং তার ভিত্তিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা (Master Plan) প্রণয়নে। ঢাকা শহরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী- আমরা কেউ কি তা জানি? কোন পথে চলেছে আমাদের প্রিয় শহর? কোন গন্তব্যে? 

একটা নগরকে মানুষের জীবনের সাথে তুলনা করা যায়। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন মানুষ যেমন জীবনের টানাপোড়নে একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন শহরও তাই। বর্তমান সময়ের জন্য এ কথাটা আরো বেশী করে সত্য। আমরা এখন একটা নতুন শতকের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে আছি। তথ্য প্রযুক্তির নিত্য নতুন আবিষ্কার, টেকসই উন্নয়ন ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে একেবারেই ভিন্ন একটা শতক। এরকম একটি সময়ের মোকাবিলায় আধুনিক বিশ্বের একটা শহরের কী করণীয়, তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত- এগুলো পৃথিবীর বেশীরভাগ শহর অনেক আগেই নির্ধারণ করে ফেলেছে। আমি কিছুদিন আগে টেক্সাসের যে ছোট্ট শহরে ছিলাম, সেই Lubbock শহরেরও একুশ শতকের মোকাবিলায় নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে (পড়ুন Goals for Lubbock: A vision into the 21st Century)।  

এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো কিন্ত্ত কোন বিশেষজ্ঞমহল নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দেয় নি। রীতিমতো সাধারণ মানুষের উপর জরিপ চালিয়ে, তাদের মতামত নিয়ে তারপর নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে শহরের পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে দিক নির্দেশনা যেমন আছে, তেমনি আছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নান্দনিকতা- ইত্যাদি আনুষংগিক সব বিষয়ের উপর আলোকপাত। এর উপর ভিত্তি করেই এখন বিশেষজ্ঞরা নতুন পরিকল্পনা তৈরী করছেন, শহর বর্ধিষ্ণু ও সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রয়োজনে যে সব বিষয়ে অস্পষ্টতা আছে, সেখানে নতুন করে নাগরিক মতামত নেয়া হচ্ছে। এমনটাই তো স্বাভাবিক। মানুষের জন্যই নগর; তাই নগর পরিকল্পনা যদি নাগরিকদের আশা-আকাংখাকে প্রতিফলন না করে, তবে তা অর্থহীন হতে বাধ্য।  

অবিলম্বে তাই নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে ঢাকাসহ আমাদের সব শহরগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং সে রোডম্যাপ অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। মিডিয়া এক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

নগর ব্যবস্থাপকের (সিটি ম্যানেজার) পদ সৃষ্টি  

একটা শহরের প্রধান এবং সবচাইতে দুরূহ কাজ কিন্তু এর ব্যবস্থাপনা। একজন দক্ষ নগর ব্যবস্থাপকই পারে একটা শহরকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে, নগর প্রশাসনের সব কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে। আধুনিক বিশ্বে সিটি ম্যানেজার তাই নগর প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ, এমন কী মেয়রের চাইতেও। আমাদের মনে রাখতে হবে মেয়র একটি রাজনৈতিক পদ এবং প্রতি পাঁচ বছর পরপর মেয়র পরিবর্তন হয়। মেয়রের নগর ব্যবস্থাপনায় কোন প্রশিক্ষণ থাকে না এবং তার দরকারও নেই। মেয়রের সহযোগী হিসেবে সিটি ম্যানেজাররাই এ কাজ করে।  যে যত সফল মেয়র খোঁজ নিলে দেখা যাবে তার সাফল্যের পেছনে রয়েছে একজন দক্ষ নগর ব্যবস্থাপক ও তার সহযোগীরা। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হবে। যেমন- আমাদের মন্ত্রণালয়গুলোতে রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত মন্ত্রী হচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের প্রধান, কিন্তু সচিব ছাড়া কার্যত মন্ত্রণালয়গুলো অচল। ঠিক তেমনি সিটি ম্যানেজারবিহীন শুধু রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত মেয়র পদ নিয়ে আমাদের নগর প্রশাসনগুলোও বর্তমানে অচল অবস্থায় আছে।

সিটি ম্যানেজার পদগুলিতে সাধারণত নগর পরিকল্পনায় অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সংগত কারণেই লোক প্রশাসনে দক্ষতা ও ব্যবসা প্রশাসন সম্পর্কে ধারণাও বিবেচনা করা হয়। তিন পেশার প্রয়োজনীয় মিশেলে তৈরী এই পদ তাই নগর প্রশাসনের সবচেয়ে শীর্ষস্থানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পদ। আমাদের নগর প্রশাসণগুলোকে কার্যকর এবং রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করতে চাইলে সিটি ম্যানেজার নিয়োগের বিকল্প নেই।  

যমজ শহরের সন্ধানেঃ সিস্টার সিটি কনসেপ্ট  

বর্তমান পৃথিবীতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষে মানুষে যেমন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তেমনি পৃথিবীর দু’প্রান্তের দু’টি শহরও পরস্পরের সাথে মেলবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এ ধারণাকে বলা হয় ‘টুইন সিটি’ বা ‘সিস্টার সিটি’ কনসেপ্ট। মূলত দু’টি অচেনা শহরের নাগরিকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় এর মূল উদ্দেশ্য হলেও উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলো উন্নত দেশের শহরগুলোর সাথে এভাবে সম্পর্ক সৃষ্টি করে নগরীর উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তা পেয়ে থাকে। তাছাড়া পর্যটনের প্রসারেও এর ভূমিকা রয়েছে। ধরা যাক, ঢাকা বিদেশের কোন শহরের সিস্টার সিটি হল। সেই শহরের অধিবাসীদের অনেকেই তখন ঢাকাকে জানতে বাংলাদেশে ভ্রমণে আগ্রহী হবে। দুঃখের বিষয়, পাশের দেশ ভারতের অনেকগুলো শহর পৃথিবীর বড় বড় শহরের সিস্টার সিটি হলেও আমাদের কোন শহর এখনো এ তালিকায় নেই। অথচ নগর কর্তৃপক্ষগুলো একটু উদ্যোগ নিলেই এটা হয়ে যায়; এতে পয়সা খরচের কোন ব্যাপার নেই, বরং পয়সা আসার রাস্তা হবে।

(চলবে)

মন্তব্য নেই

২০৭১ সালে বাংলাদেশের কি বাকি থাকবে?

তারিখ June 20th, 2008
ব্লগার সুবিনয় মুস্তফী বিষয় অনিশ্চিত

তরুন সাংবাদিক জোহান হারি গিয়েছিলেন সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে। এক মাসের বাংলাদেশ সফরে। সেই সফরের গল্প লিখেছেন ইন্ডেপেন্ডেন্ট সংবাদপত্রের জন্যে।

তার রিপোর্টে অনেক কিছুই আছে। আছে পানির ক্রমবর্ধমান লবনাক্ততার কথা। সেখান থেকে সৃষ্ট অসুখ-বিসুখের কথা। IPCC-র মতে ২০৫০ সাল নাগাদ আমাদের ভূখন্ডের ৬ ভাগের ১ ভাগ মাটি সমুদ্রের তলে বিলীন হয়ে যাবে। দক্ষিনাঞ্চলের ২ কোটি লোক রেফিউজি হবে। লক্ষ লক্ষ একর আবাদী জমি পানির নীচে ডুবে যাবে। যার ফলে আমাদের খাদ্য উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমে যাবে।

তখন খাওয়াবে কে? পড়াবে কে? ভাসবে কে? ডুববে কে? ওদিকে প্রতিবেশী দেশগুলো যে নির্মান করছে প্রাচীর…

*

হারি লিখেছেন বিচিত্র এক ভাসমান প্রজেক্টের কথা। আবুল হাসনাত মোহাম্মদ রেজওয়ানের সিদুলাই স্বনির্ভর সংস্থা।

He has turned himself into Bangladesh’s Noah, urging his people to move on to boats as the Great Flood comes. Rezwan built a charity – Shidhulai Swanirvar Sangstha, which means self-reliance – that is building the only schools and hospitals and homes that can last now: ones that float.

We clambered on to his first school-boat, which is moored in Singra. In this area there is no electricity, no sewage system, and no state. The residents live the short lives of pre-modern people. But now, suddenly, they have a fleet of these boats, stocked with medicines and lined with books on everything from Shakespeare to accountancy to climatology. Nestling between them, there are six internet terminals with broadband access.

বিচিত্র গল্পই বলতে হবে। দুই কোটি লোকের তাহলে গ্রহণ করতে হবে বেদে-র জীবন? আর বাঙালির নতুন পরিচয় - উভচর প্রাণী।

*

কিন্তু ২০৫০ বা ২০৭১ তো অনেক দূর। ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই।

তাই আজকে ২০০৮ সালে ঢাকার রাজনীতিক শাসক শ্রেণী এবং তাদের চামুন্ডারা কামড়াচ্ছেন দুই দিনের লোভ, দুই দিনের ক্ষমতা, দুই দিনের চুরি চামারির জন্যে। রোম যখন পুড়ছিলো, নিরো কি করছিলো?

মন্তব্য নেই

স্ট্যাগফ্লেশান - কি ও কেন? (১)

তারিখ June 7th, 2008
ব্লগার সুবিনয় মুস্তফী বিষয় অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি

গতকাল বিশেষজ্ঞ মহলকে তাজ্জব করে দিয়ে তেলের দাম এক ধাক্কায় ১০ ডলার উঠে গেলো। ১২৯ ডলার থেকে ১৩৯ ডলার। এক দিনে এত বড় বৃদ্ধি অভাবনীয় ব্যাপার। এর মানে হলো বিশ্ব অর্থনীতি মোটামুটি পঙ্গু হওয়ার দিকে চলে যাচ্ছে। দিনের পর দিন এহেন মূল্যবৃদ্ধি সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই। গত বছর আগস্ট মাসে যেই মন্দার সূত্রপাত হয়েছিল, বিগত নয় মাস ধরে যেই মন্দা আসি আসি করছিলো, সেটাই এখন বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রবল বেগে আমাদের উপর হামলে পড়তে উদ্যত হয়েছে। সামনের কয়েক মাস খুব খারাপ যাবে, সেটা সন্দেহাতীত। কিন্তু এই মন্দা কতদিন দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেটা যেমন বলার উপায় নেই, তেমনই বলার উপায় নেই এর শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে। আপাতত এতটুকু বলে রাখি যে অর্থনীতিতে একেই অভিহিত করা যায় perfect storm হিসাবে।

এই প্রলয়ের টেকনিকাল নাম স্ট্যাগফ্লেশান (stagflation)। আগামী বছরে এই শব্দটা সংবাদপত্র মিডিয়া মাধ্যমে প্রায়ই দেখবেন। ৭০-এর দশকে এই জিনিস প্রথম দেখা গিয়েছিল। আজ ৩০ বছর পরে স্ট্যাগফ্লেশান ফিরে এসেছে তার বিষাক্ত রূপ নিয়ে। এই স্ট্যাগফ্লেশান-কে ঘিরে তাই শুরু করছি নতুন সিরিজ - আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে সিরিজের আয়ু হবে দীর্ঘকালের!

শুরুতে stagflation শব্দের উৎপত্তিটা একটু ঘেঁটে দেখি। এটা মূলত দুটো ইংরেজী শব্দের সমন্বয়ে গঠিত :

- stagnation অর্থাৎ স্থবিরতা, বা অর্থনৈতিক মন্দা

- inflation অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বা দৈনন্দিন সামগ্রীর দামের উপর্যুপরী বৃদ্ধি।

এই দুইয়ে মিলে হয় stagflation। সাধারণ অর্থনীতির শাস্ত্রে বলে যে অর্থনৈতিক স্থবিরতার পাশাপাশি নিয়মিত মূল্যস্ফীতি চলতে পারে না। অর্থনীতি একেবারে অথর্ব, তার তাপমাত্রা শীতল, ব্যবসা বাণিজ্যে তেমন কোন গতি নেই, এমতাবস্থায় জিনিসপত্রের দাম উত্তরোত্তর বাড়তে পারে না। অন্তত গতানুগতিক থিওরি আমাদের তাই শেখায়।

কিন্তু খুব জরুরী অবস্থায় এই তত্ত্ব কাজ করে না। ৭০-এর দশকে অর্থনীতিবিদেরা প্রথমবারের মত স্ট্যাগফ্লেশান জিনিসটাকে বিস্ময়ের সাথে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। একদিকে অর্থনীতির মরণাপন্ন দশা, পাশাপাশি বেপরোয়া ইনফ্লেশান। এটা কিভাবে সম্ভব হয় সেটাই আমরা ধীরে ধীরে দেখবো এই সিরিজে। ৩০ বছর পরে আবার কি কারনে স্ট্যাগফ্লেশান ফিরে এলো, সেটাও এখন খতিয়ে দেখার উৎকৃষ্ট সময়।

আগামী খন্ডে - মূল্যস্ফীতির পেছনের কাহিনী।

2টি মন্তব্য

ঢাকার নগর পরিকল্পনা : সমস্যা ও সম্ভাবনা- ৪

তারিখ May 19th, 2008
ব্লগার তানভীর ইসলাম বিষয় অনিশ্চিত
তানভীর ইসলাম

টেকসই নগর পরিকল্পনা ও ঢাকার সম্ভাবনা

আজকাল টেকসই উন্নয়ন, টেকসই অর্থনীতি ইত্যাদি বাজারে খুব চালু শব্দ। টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংজ্ঞাটি সম্ভবত প্রদান করেছিল জাতিসংঘের বিশ্ব পরিবেশ ও উন্নয়ন কমিশন (World Commission on Environment and Development ), ‘ব্রান্টল্যান্ড কমিশন’ নামে যা বিখ্যাত। ১৯৮৭ সালে “Our Common Future” শীর্ষক রিপোর্টে তারা টেকসই উন্নয়নের যে সংজ্ঞা দিয়েছিল তা নিম্নরূপ-

Development that meets the needs of the present without compromising the ability of future generations to meet their own needs. [যে উন্নয়ন ভবিষ্যত প্রজন্মের চাহিদার সাথে আপোষ না করে বর্তমানের চাহিদাকে পূরণ করে]

‘টেকসই’ শব্দের মূল কথা এটাই- এমন কিছু করা যাবে না যা ভবিষ্যত প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। আমরা শুধু আমাদের বর্তমান চাহিদার কথা ভেবে যা খুশী করে চলবো, তা হবে না; ভবিষ্যত চাহিদার দিকে দৃষ্টি রেখে বর্তমানের চাহিদাকে পূরণ করতে হবে।

মূলত এ ধারণাকে পুঁজি করে আশির দশকের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নব্য নগরবাদ (New Urbanism) নামক নগর পরিকল্পনার নতুন ধারা সূচিত হয়। এখানে এর প্রেক্ষাপট একটু বর্ণনা করি। বিংশ শতকের গোড়ায় যান্ত্রিক-গাড়ী এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেল আবিষ্কারের পর থেকে উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ শহর গড়ে উঠেছিল ছোট গাড়ী চলাচলকে কেন্দ্র করে- এজন্য এসব শহরকে অনেক সময় ‘অটোমোবাইল টাউন’ও বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরাজ্যীয় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা (Interstate Highway) তো এক বিশাল বিস্ময়, যা গড়ে উঠেছে এই ছোট গাড়ী চলাচলকে কেন্দ্র করেই। কর্মব্যস্ত শহরের বাইরে নিরিবিলি বসবাসের জন্য ব্যাপক হারে গড়ে উঠেছে অনেক শহরতলী (Urban Sprawl) যেগুলো উড়াল পথ (Elevated Way) এবং বড় বড় রাস্তার মাধ্যমে সংযুক্ত। মূল শহরকেও আবার আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ইত্যাদি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে (i.e. zoning) যেখানে কর্ম, বিনোদন, শিক্ষা ইত্যাদি প্রয়োজনে যেতে হলে গাড়ী ব্যবহার না করে উপায় নেই।

নব্য নগরবাদীরা বলছেন গাড়ী-কেন্দ্রিক এ শহরগুলো মোটেও টেকসই নয়। কারণ-

প্রথমত, জীবাশ্ম জ্বালানী নির্ভর গাড়ী পরিবেশ দূষণ করে; অধিক গাড়ী এবং অধিক দূরত্ব মানে অধিক দূষণ। তারা বলছেন, মানুষের চাহিদাগুলোকে যদি স্বল্প দূরত্বের মধ্যে মিটানো যায়, তবে গাড়ীর উপর এ নির্ভরতা ও পরিবেশ দূষণ অনেক কমানো যায়।

দ্বিতীয়ত, উড়াল পথ এবং বড় বড় রাস্তা নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে খরচ অনেক বেশী হয় এবং প্রচুর জায়গা লাগে। তুলনামূলকভাবে রেলপথ নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে খরচ ও জায়গা কম লাগে এবং পরিবেশ দূষণও কম হয়।

তৃতীয়ত, অধিক শহরতলী সৃষ্টির ফলে কৃষিজমি ও খোলা জমি ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে যা উদ্বেগজনক। আমরা ইতিমধ্যেই সারা পৃথিবীতে খাদ্য সংকট দেখছি, ভবিষ্যতে তা আরো ভয়াবহ হতে পারে।

তাহলে, নব্য নগরবাদীদের ধারণা অনুযায়ী একটা টেকসই নগর কীরকম হতে পারে? এটা অঞ্চলভিত্তিক না হয়ে হবে সব কিছুর মিশ্রণ। মানুষ যেখানে থাকবে সেখানেই সে বিনোদনের জন্য হেঁটে হেঁটে কোন সিনেমায় যাবে, বা কোন কফি শপে, এমন কী কাজেও যেতে পারে। বাড়ীর নীচে বা কাছাকাছি দূরত্বে ছোট ছোট দোকান-পাট থাকবে যা তার দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করবে। এর ফলে গাড়ীর উপর তাকে নির্ভরশীল হতে হবে না। আর যদি কর্মস্থল দূরে থাকে বা দূরে কোথাও যেতে হয়, তবে রেল বা গণযোগাযোগ ব্যবস্থা থাকবে। মোট কথা, ছোট গাড়ীর উপর নির্ভরতা কমাতে হবে। আমাদের শহরগুলোতে যেখানে রাস্তাঘাট এমনিই কম, সেখানে ছোট গাড়ীর প্রভাব আরও ভয়াবহ। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ধরা যাক, একটা ছোট গাড়ীতে সবোর্চচ চার জন বসতে পারে এবং একটা বাসে চল্লিশ জন। বাসের লোকগুলোকে যদি গাড়ীতে পাঠানো হয়, তাহলে আমাদের সবর্নিম্ন দশটা ছোট গাড়ী লাগবে। চিন্তা করে দেখুন, দশটা গাড়ী রাস্তায় কত জায়গা নেবে আর কি পরিমাণ দূষণ হবে; সে তুলনায় সমপরিমাণ লোকের জন্য মাত্র একটা বাসের জায়গা আর দূষণ কি পরিমাণ হবে। আর রেলের তো কথাই নেই। যাত্রীও বেশী নিতে পারে, আবার যেহেতু ভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে তাই রাস্তার উপরও কোন চাপ পড়ে না।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরে দেখা যায়, যার গাড়ী নেই, সে চাকরী পায় না। গণযোগাযোগ ব্যবস্থা তাই বৈষম্য কমাতেও সাহায্য করে। এছাড়া শহরগুলো মিশ্র এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠার ফলে জায়গার মূল্য কমে আসে। শুধু আবাসিক বা শুধু বাণিজ্য এরকম এলাকায় জায়গার দাম সবসময় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থাকে। আর শহরতলী সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা না থাকায় শহরের বাইরে অবস্থিত কৃষি ও খোলা জমিগুলোও রক্ষা পায়।

নব্য নগরবাদীরা বর্তমানের ‘তথাকথিত আধুনিক’ শহরের পরিবর্তে যে ‘টেকসই নগরের’ কথা বলছেন তা থেকে আমাদের বাংলাদেশের শহরগুলো কিন্তু খুব বেশী দূরে নেই। ‘নব্য নগরবাদ’ ধারণা মূলত নস্টালজিক যা গাড়ী-পূর্ব যুগে আমাদের ফিরে যেতে বলে। ঢাকা শহরের মাত্র তিন শতাংশ লোক গাড়ী ব্যবহার করে, দেশের অন্যান্য শহরগুলোতে তো আরও কম। এছাড়া উন্নত বিশ্বের শহরগুলোতে গাড়ী-কেন্দ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন হয়েছে আমাদের শহরগুলোতে তার কিছুই হয় নি। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠার ফলে আমাদের শহরগুলো মিশ্র একটা রূপ নিয়েছে। একটু অন্যভাবে যদি দেখি উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমরা এখনো মূলত সেই গাড়ী-পূর্ব যুগেই বসবাস করছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো আমরা হেঁটে ঘরের পাশের মুদি দোকান থেকেই কিনি। আমাদের অধিকাংশের প্রধান যানবাহন রিকশা যার কোন পরিবেশ দূষণ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের মত একটি পুঁজিবাদী দেশে যেখানে তেল ও গাড়ী কোম্পানীগুলোর পুঁজির জোর বেশী সেখানে ‘টেকসই নগরের’ ধারণা বাস্তবায়ন যেমন খুব কঠিন (ধীর গতিতে কিছু কাজ যদিও হচ্ছে), তেমনি বিস্ময়করভাবে আমাদের পশ্চাৎপদতা, আমাদের শহরগুলিতে এখনো গাড়ী-পূর্ব যুগের সেই আবহ ‘টেকসই নগর’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদেরকে তাদের চাইতে অনেক এগিয়ে রেখেছে; ‘শাপে বর’ হিসেবেই যাকে বলা যায়। আমাদের এখন যা প্রয়োজন তা হলো- অপরিকল্পিতভাবে মিশ্র এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠা শহরগুলোয় একটু পরিকল্পনার ছোঁয়া আনা এবং তার জন্য সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন জরুরী। আমি চাইলাম আর দোকান দিয়ে দিলাম তা হবে না; বরং মানুষের চাহিদা আর পরিবেশের সাথে তা সংগত কিনা যাচাই করে অনুমতি দিতে হবে। আর যা কিছু সংগত নয়, তা উচ্ছেদ করতে হবে।

রিকশা যদিও পরিবেশ দূষণ করে না, কিন্তু এটি একটি অমানবিক বাহন। তাছাড়া রাস্তা সাধারণত অযান্ত্রিক বাহনের কথা চিন্তা করে বানানো হয় না। রিক্সার উপর নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের ছোট ছোট দূরত্বে হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। তার জন্য পথচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং হাঁটাচলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যা এখন একেবারেই নেই। সরকার সম্প্রতি ঢাকার জন্য ২০ বছর ব্যাপ্তির ‘কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা’ (এসটিপি) হাতে নিয়েছেন যাতে পথচারীদের ব্যাপারটা অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করলেও বাজেটে এর জন্য বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। পরিকল্পনায় আরও নতুন যেসব উড়াল পথ তৈরীর প্রস্তাবনা আছে সেগুলোর ব্যাপারে আরো চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। কারণ প্রথমত এগুলো টেকসই অপশন নয়, এগুলো রাস্তায় ছোট গাড়ীকেই আরো বেশী প্রমোট করবে; দ্বিতীয়ত শুনেছি এর অধিকাংশ কোন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের চাপে করা করা হয়েছে। তাই প্রয়োজনে এ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে পথচারীদের খাতে ব্যয় করা যেতে পারে।

আমাদের উড়াল পথের চেয়ে বেশী প্রয়োজন আমাদের গণযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করা যার জন্য সাবওয়ে/স্কাই ট্রেনের কোন বিকল্প নেই (সাবওয়ে না স্কাইট্রেন এ বিতর্কে আমি যেতে চাই না; এসটিপিতে মনে হয় মেট্রো/সাবওয়ের কথা বলা হয়েছে)। বাস সার্ভিস, নেটওয়ার্ক এগুলোও আরো উন্নত করতে হবে যেন বেশী লোক এগুলো ব্যবহারে উৎসাহিত হয়। মোট কথা, বাধ্যতামূলকভাবে ছোট দূরত্বে হাঁটা এবং দূরপাল্লার দূরত্বে গণযোগাযোগ ব্যবস্থা ‘সবার জন্য চালু’ করতে যা যা করা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হলে ঢাকার পরিবেশ, যানজট ইত্যাদির অভাবনীয় উন্নতি হবে এ আশা করাই যায়।

পরিশেষে বলব ‘টেকসই নগর’-এর ধারণা পরিবেশের উন্নতির পাশাপাশি আমাদের শহরগুলোকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে । এ সুযোগকে কাজে লাগানো উচিত।

(চলবে)

4টি মন্তব্য

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি

তারিখ May 19th, 2008
ব্লগার নিির্ভতচারী বিষয় সমাজ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি

রাজনৈতিক সংস্কৃতি যে কোন জাতির মানসিক পরিপক্কতার পরিমাপ সূচক। সমাজ বিজ্ঞানীরা কোন জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি আর আচার আচরণ কিভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কিভাবে প্রভাবিত করে এবং তার ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর ভূমিকা কিভাবে নির্ধারিত হয় সেটা বোঝাতে পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। কাজেই একটা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনে উদ্যোগী হতে হলে সে দেশের জনগণের রাজনৈতিক সংস্কৃতি জানা অত্যান্ত জরুরী। Almond এবং Verba রাজনৈতিক সংস্কৃতির বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “The specifically political orientations–attitudes towards the political system and its various parts, and attitudes toward the role of the self in the system.‍” বিদ্যমান নিবন্ধে একাডেমিক আলোচনার অবতারণা করা আমাদের লক্ষ্য নয়। আজকের তরুণ প্রজন্ম যাতে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বাংলাদেশকে একবিংশ শতকের উপযোগী রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এই আলোচনা। এই অনুসিদ্ধকে সামনে রেখেই আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বরূপ খোজায় মনোযোগী হবো।
ভৌগলিক অবস্থান
একটা দেশের ভুগোল কি সে দেশের বসবাসরত মানুষের চরিত্রে কোন প্রভাব ফেলে? সমাজ বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে একমত। রুক্ষ এলাকার অধিবাসীদের মেজাজ মর্জি অনেকটা রুক্ষ আর অমার্র্জিতই হয়। উষ্ঞ এলাকার লোকেরা কিছুটা আরাম প্রিয়, আবার পাহাড়ী এলাকার লোকেরা সহজাত কারনেই বেশ কষ্ট সহিষ্ঞু। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পুরো বাংলাদেশ বৈচিত্রহীন এক সমতল ভূমি । নরম পলিমাটি এদেশের মানুষকেও করেছে স্বভাবে নরম। অন্যদিকে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনাও মানুষের চরিত্রে বেশ ছাপ রাখে। কোন আগাম সতর্ক বাণী ছাড়াই বাংলাদেশের প্রকৃতি হঠাত্‍ রুদ্র হয়ে ওঠে। এদেশের মানুষেরাও যেন সেরকমই। হঠাত্‍ করেই তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠে, তখন লক্ষ্য অর্জনে সবর্স্ব পণ করতে মানুষগুলো দ্বিধা করেনা। ‌‍৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ আর ৯০ এর এরশাদ বিরোধী অভ্যুত্থান সে কথাই আমাদের স্বরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মানুষেরাই পাকিস্তান আন্দোলনে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল । কিন্তু নিজেদের পরিচয়ের ব্যাপারটি যখন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়, সে সাধের পাকিস্তানকে ছুড়ে ফেলতে তারা দ্বিধা করেনি।

ধর্ম

যেকোন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ধর্ম ব্যপকভাবে প্রভাবিত করে। সেটা পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোর জন্যও সত্য। এবারে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের দ্বিতীয় দফা নিবার্চনে নব্য খ্রীস্টবাদীরা বেশ ব্যপক ভূমিকা রেখেছে। ইরাক আক্রমনের আগে জর্জ বুশ ইশ্বরের নিদের্শনা পাওয়ার জন্য সারা রাত গির্জায় কাটিয়ে সকাল বেলা সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন। আমেরিকার দক্ষিনের রাজ্যগুলো এখনো বাইবেল বলয় হিসেবেই পরিচিত। ধর্ম মানুষের আলাদা জাতীয় পরিচয়ও দেয়। ভারত ভাগ হয়েছিল ধর্মের ব্যবধানকে সামনে রেখেই। বাংলাদেশের শতকরা ৮৮ ভাগ লোক মুসলমান। আর এই মুসলমান হবার সুবাদে দেশের রাজনৈতিক সরকার নিবার্চনে ধর্ম বেশ ভালোই ভূমিকা নেয়। নিজেরা খুব যে ধর্মভীরু ব্যাপার সে রকম নয়। কিন্তু ধর্মকে সব সময়ই একটা বিবেচনা হিসেবে মানুষ সামনে রাখে। কাজে কাজেই নিবাচর্ন এলেই আওয়ামী লীগের মতো ধর্ম নিরপেক্ষ দলকেও মাথায় পট্টি আর হাতে তসবিহ নিয়ে জনগণকে নিজেদের ঘরে ভেরানোর প্রয়াশ নিতে দেখা যায়। বি. এন. পি নেতাদের ওমরা করার হিড়িক পড়ে যায়। কেউ “খুশি হবে আল্লায় ভোট দিলে পাল্লায়” বলে জনগণের ধর্মীয় দূবর্লতাকে নিজেদের ফেরে আনতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর ধর্ম চিন্তা নয়, ধর্মের প্রতি জনগণের দূবর্লতাই এর কারণ।

আরো পড়তে থাকুন…

মন্তব্য নেই

ভূ-গর্ভে পানি সঞ্চয়

তারিখ May 15th, 2008
ব্লগার মিয়া মোহাম্মদ হুসাইনুজ্জামান বিষয় চিন্তাভাবনা, পরিবেশ, পানি সরবরাহ

ছাপার যোগ্য পি.ডি.এফ-এর জন্য এখানে ক্লিক করুন

সারসংক্ষেপ: ক্রমবর্ধিষ্ণু চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পানিসরবরাহের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানিস্তর থেকে যে পরিমান পানি সংগ্রহ করা হয়, স্বাভাবিক উপায়ে সেটা পূরণ বা পূণঃসঞ্চিত হয় না। ফলশ্রুতিতে পানির স্তর নিচে নেমে বিভিন্নরকম অসুবিধার সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় হল ভূ-গর্ভে কৃত্রিম উপায়ে পানি সঞ্চিত করা যেন তা পানি সংগ্রহে হারানো পানির অভাব পূরণ করে। এই প্রবন্ধে কৃত্রিম উপায়ে ভূ-গর্ভে পানি সংগহ করার উপায়ের উপরে আলোচনা করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় শব্দ তালিকা: পানিস্তর, পূণঃসঞ্চয়ী কূপ, পানি সঞ্চয়
পরিভাষার তালিকা: Aquifer – পানিস্তর; Underground – ভূ-গর্ভ; Groundwater recharge – ভূ-গর্ভে পানিসঞ্চয়; Reservoir – জলাধার; Recharge well – পূণঃসঞ্চয়ী কূপ

ভূমিকা

.
ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় নিত্যব্যবহার্য পানির মূল উৎস ভূ-গর্ভস্থ জলাধার বা আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার। কিন্ত অতিব্যবহারে এই প্রাকৃতিক জলাধার শূন্য হতে চলেছে এবং পানির স্তর আরও গভীরে চলে যাচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে পানিস্বল্পতার কারণে এবং পানিস্তরের গভীরতা বৃদ্ধিজনিত ব্যয়বৃদ্ধির কারণে এই উৎস হতে পানি সংগ্রহ হুমকীর সম্মুখীন হয়ে পড়বে।
মনে হতে পারে যে কোন জলাধার থেকে পানি নিলে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু ভূ-গর্ভের প্রাকৃতিক জলাধারের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণ হল যে পরিমান পানি এখান থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে সেই পরিমান পানি স্বাভাবিকভাবে এতে সঞ্চিত/সংগৃহীত হতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
এ ধরণের প্রাকৃতিক সম্পদের (Resource) ক্ষয় (Depletion) কারো কাম্য নয়। এই ক্ষয় রোধকল্পে এই পানিস্তর থেকে পানি সংগ্রহের পরিমান এতে পানি সঞ্চিত হওয়ার হারের সমান অথবা এর চেয়ে কম হওয়া বাঞ্ছনীয়। দৈনন্দিন জীবনে পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প ব্যবস্থা না করে পানি সংগ্রহের পরিমান কমানোও প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া পানি সংগ্রহের পরিমান কমিয়ে দিলেও একাজে ব্যবহৃত স্থাপনাগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকবে যা সম্পদের অপচয় হিসেবেই গণ্য হবে। তাই, বর্তমান পানি সংগ্রহের পরিমান না কমিয়ে বরং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরে পানি সঞ্চয়/সংগ্রহের পরিমান বাড়ানোর উপায় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই প্রবন্ধে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে পানির সঞ্চয়ের উপায় হিসেবে কৃত্রিমভাবে ভূ-গর্ভে পানিসঞ্চয় (Artificial groundwater recharge) বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
আরো পড়তে থাকুন…

একটি মন্তব্য

খাঁড়ার ঘা - জৈবজ্বালানী ইথানলের কথা

তারিখ May 13th, 2008
ব্লগার সুবিনয় মুস্তফী বিষয় ইথানল, কৃষি, ক্ষুধা, খাদ্য, জৈবজ্বালানী, জ্বালানী, তেল, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, বায়োফুয়েল, বিকল্প জ্বালানী, মূল্যস্ফীতি

(ছবি সূত্র - www.ontariocorn.org)

ধীরে হলেও পশ্চিমা বিশ্বে অবশেষে জৈবজ্বালানী ইথানল বিরোধী লবি দানা বেঁধে উঠছে মনে হয়। আজকে অন্তত দুটো সংবাদ আইটেম দেখে তাই মনে হচ্ছে। প্রথমটি বৃটিশ অর্থমন্ত্রীর ইথানলের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি। দ্বিতীয়টি আমেরিকাতে ইথানল বিরোধী কোয়ালিশনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা। তবে দিল্লী অবশ্যই বহুত দূর। আসলে এদের দিয়ে কিছু হবে কি না শেষমেষ, কে জানে। প্রতিপক্ষ যে বেশ শক্তিশালী।

ইথানল জিনিসটা নিয়ে অনেক সমস্যা। পেট্রোল বা ডিজেল তেলের বিকল্প জ্বালানী হিসেবে এটা ডেভেলপ করা হয়েছিল। আমাদের দেশে সিএনজি যেমন। জ্বালানী হিসেবে এর প্রচলন করতে গিয়ে মার্কিন সরকার, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও প্রচুর কাঠ-খড় (এবং ইথানল) পুড়িয়েছে। আপাত উদ্দেশ্য - মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানীকৃত তেলের উপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমাতে হবে। কারনে অকারনে ইস্রাইল, প্যালেস্টাইন, ইরাক, সৌদি আরব - এসব জায়গায় নাক গলিয়ে তো লোকসান বই লাভ হলো না।

ব্রাজিলীয় ইক্ষু বনাম মার্কিনী ভুট্টা
তাই দরকার নিজ দেশে তৈরী ইথানল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুটো ইথানল উৎপাদক দেশ হলো ব্রাজিল এবং আমেরিকা। এদের ইথানল তৈরীর কাঁচামাল অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন। ব্রাজিল হলো ট্রপিকাল দেশ। ওদের আখের প্রডাকশন হয় প্রচুর। এই ইক্ষু থেকেই ওরা ইথানল তৈরী করে। এবং বেশ সফলও হয়েছে - তাদের সরকারের হিসাবে ব্রাজিল জ্বালানীতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে চলেছে। এই সফলতার পেছনে অন্তত একটা কারন হলো এই যে - ইক্ষু হচ্ছে ইথানল তৈরীর একটি উৎকৃষ্ট সূত্র। Highly efficient source.

পক্ষান্তরে আছে আমেরিকা এবং তাদের ইথানল। মার্কিন দেশে ইথানল তৈরী হয় ভুট্টা থেকে। আমরা যাকে বলি maize, ওরা তাকে বলে corn। এই কর্ন থেকে ইথানল বানাতে গিয়ে মার্কিনরা বিরাট ফ্যাসাদ তৈরী করে ফেলেছে। ইদানীংকালে সারা বিশ্বে খাদ্যদ্রব্যের দাম ভয়ংকরভাবে বেড়ে যাওয়ার পিছনে ইথানল কর্মসূচীকে বড় দোষী হিসাবে দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে আরো কারন আছে সন্দেহ নেই - চীন ও ভারতে খাবারের চাহিদা বৃদ্ধি, কিছু অযাচিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নগরায়নের ফলে আবাদী জমি হ্রাস, হেন তেন। কিন্তু এসবের পাশাপাশি ইথানলের অবদানটা নাকচ করা যায় না।

নাকচ করা যায় না, তার বড় কারন আধুনিক “বাণিজ্যিক” খাদ্যশিল্পে ভুট্টার সীমাহীন প্রয়োজন। A zillion uses of corn নামে ওয়েবসাইট আছে, যেখানে ভুট্টার লাখো ব্যবহার তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে। মদ থেকে টফি-লজেন্স, কোক থেকে কুকি বিস্কুট, কর্নফ্লেক্স, ইন্সট্যান্ট কফি, রুটি, ভোজ্য তেল, এমনকি টুথপেস্ট-এও ভুট্টা-নিস্রিত উপাদান ব্যবহৃত হয়। আর এতো গেল কেবল খাবার জাতীয় জিনিসের কথা। নিত্য ব্যবহার্য আরো হাজারো জিনিসে কর্নের প্রয়োজন। বলা হয় যে দৈনন্দিন জীবনে পশ্চিমারা যত কিছু কেনে একটা গড়পরতা সুপার মার্কেট থেকে, তার প্রায় ২৫% শতাংশ জিনিসেই কর্ন কোন না কোনভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। সেই বিশাল লিস্টের কিয়দংশ পাবেন উপরের লিংকে।

Food or Fuel? - অদূরদর্শী পলিসির কুফল
এখন সমস্যা হয়েছে এই কর্ন-কে খাবার থেকে জ্বালানী খাতে ঘুরিয়ে নেয়ায়। যেই নীতিকে অভিহিত করা হচ্ছে Food or fuel নামে। পাশ্চাত্যের অদূরদর্শী নীতির এ এক চরম উদাহরন। খায়েশ ছিল গাড়ির জ্বালানী আরো সহজলভ্য হবে। কিন্তু অপর দিকে খাবারের দাম যে সাঁই সাঁই করে বেড়ে যাবে, সেই কথা তাদের খেয়াল ছিল না। অথবা বিরোধীপন্থী এক্সপার্টদের মতামতকে তারা অগ্রাহ্য করেছিল। এখন তার সর্বনাশা ফলাফল - বাড়ন্ত খাবারের দাম, এবং ফলে পৃথিবীর অন্যত্র ক্ষুধা, হাহাকার, হয়তো দুর্ভিক্ষ।

এর বিরুদ্ধে উচ্চ মহলে কথা বলার লোক এতদিন বলতে গেলে ছিলই না। তবে ধীরে ধীরে টনক নড়ছে। ব্যারাক ওবামা যেমন বলেছেন -

- “My top priority is making sure people are able to get enough to eat. If it turns out we need to make changes in our ethanol policy . . .  that has got to be the step we take.”

অর্থাৎ - “মানুষ পর্যাপ্ত পরিমানে খেতে পাচ্ছে কি না, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এর ফলে যদি আমাদের জ়ৈব জ্বালানী ইথানল নীতিতে পরিবর্তনের দরকার হয়, তাহলে সেই পদক্ষেপ আমি নেবো।”

তবে যা বলছিলাম, ইথানল উৎপাদক লবি সংঘবদ্ধ, শক্তিশালী। দুনিয়ার অপর প্রান্তে কে খেতে পারলো আর কে না খেয়ে মরলো, সেটা দেখার আগে নিজের ট্যাকে টাকার কথাই তারা বেশী চিন্তা করছে। দেখা যাক, ঘটনা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। এই নিয়ে সামনে আরো থাকবে।

4টি মন্তব্য

দূঃস্বপ্নের তৃতীয়, চতূর্থ, …… অথবা অনন্ত প্রহর

তারিখ May 8th, 2008
ব্লগার Snigdha বিষয় অর্থনীতি, উন্নয়ন, চিন্তাভাবনা, প্রামাণ্যচিত্র

ঊৎসর্গঃ কার্ল মার্ক্স এবং আর্তূরো এস্কোবার

আচ্ছা, বিশ্বায়ন বা উন্নয়ন জিনিষটা আসলে ঠিক কি করে বলুন তো? ও হ্যা, মনে পড়েছে । বিশ্বায়ন বা globalization হলো বিশ্বের তাবৎ আনাচ কানাচ, কোণাকাঞ্ছির মধ্যেও তথাকথিত অর্থনৈ্তিক যোগসূত্রতা স্থাপন করা, আর উন্নয়ন যে কি করে সে তো আজকাল করিমন থেকে কার্লা, হোসেন থেকে হোযে লুইস, ফরিদ থেকে ফারনান্দো - অর্থাৎ কিনা আবালবৃদ্ধবনিতা মানে বুড়ো ধূড়ো খোকা বোকা সব্বাই জানে। জানবেই, জানতেই হবে। আকাশ ভরা সূর্য্য তারার নীচে বাস করবে আর ট্রপোস্ফীয়ার এর নীচেই ঝুলে থাকা সর্বত্রবিরাজমান উন্নয়ন নামক ঈশ্বরকে চিনবে না! ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা বাংলাদেশে বসে বসে আরাম করবে আর কি কারণে ইরাকে যুদ্ধের খরচা মেটাতে সারা বিশ্বে আস্তে আস্তে মন্দা কি দূর্ভিক্ষ নেমে আসে তা বুঝে নিয়ে লক্ষ্মী ছেলেমেয়ের মতো পেটে পাথর বাঁধবে না - তা তো হয় না! হয়? আপনারাই বলুন? পৃথিবীতে কৃতজ্ঞতা বলে একটা জিনিষ আছে না? এটুকু পড়েই যেন আবার আশান্বিত হয়ে উঠবেন না - আজকের গল্পটা ঠিক বাংলাদেশকে নিয়ে কিন্তু নয়। তবে কিনা, আবার নয়ও কি? যতই হোক বিশ্বায়নের যুগেই তো বাস করছি……… যাক গে যাক, এসব ভ্যানতাড়া বাদ দিয়ে মূল কাহিনীতে আসা যাক।

আফ্রিকার লেক ভিক্টোরিয়া হলো পৃথিবীর বৃহত্তম ট্রপিক্যাল আর দ্বিতীয় বৃহত্তম মিষ্টি পানির হ্রদ। উগান্ডা, কেনিয়া আর তানযানিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই হ্রদটির বৈশিষ্ট্য কিন্তু এর আকারে নয়, এর চমৎকার বৈচিত্র্যময় জৈববৈশিষ্টের (biodiversity) কারণে এটাকে রীতিমত biological hotspot বলে গণ্য করা হয়। এবং এই হটস্পট থেকেই শুরু “ডারউইনের দূঃস্বপ্ন” এর। পরিচালক হুবার্ট সপার এর Darwin’s Nightmare ২০০৪ সালে মুক্তি পেলেও প্রামাণ্যচিত্রটি বানাবার ইচ্ছে তার হয় ১৯৯৭ সালে। সপার তখন রোয়ান্ডার রিফিউজিদের নিয়ে আরেকটি প্রামাণ্যচিত্রের কাজে তথ্য সংগ্রহ করতে মধ্য আফ্রিকায় গেছেন। রোয়ান্ডার অতি দীর্ঘ এবং অনর্থক রক্তক্ষয়ী যে গণহত্যাটি পৃথিবীর ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে তার কারণে লক্ষ লক্ষ টুটসী এবং হুটু উপজাতীয় তানযানিয়ায় উদ্বাস্ত হিসেবে আশ্রয় নেয়। চরমপন্থী হুটু রক্ষীবাহিনীর নির্বিচার এবং নৃশংস গণহত্যারফলে শুধুমাত্র ১০০ দিনের মধ্যে আট থেকে দশ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় আর স্থানচ্যুত হয় আরও অসংখ্য। একইসাথে তখন চলছে কঙ্গোর বিদ্রোহ, টুটসীরা মরছে কঙ্গোর ক্ষমতাসীন দলের হাতেও। সপার এই উদ্বাস্তদের সাথে কথা বলতে তানযানিয়ায় যান এবং সেখানে একটি অদ্ভূত দৃশ্য তার মনোযোগ আকর্ষণ করে হটাৎই। ঐ সবুজ আর অশান্ত, গাছ দিয়ে ঘেরা আর মানুষের ইতস্তত ছড়ানো লাশ দিয়ে ভরা অঞ্চলে লেক ভিক্টোরিয়ার পাশে সোভিয়েতের বানানো দুটো বিশাল আকারের মালবাহী বিমান অপেক্ষা করছে - একটি এসেছে আর একটি যাচ্ছে। দুটোই খাবারে ভর্তি। একটিতে রয়েছে জাতিসঙ্ঘ পরিচালিত রিফিউযী ক্যাম্পগুলোর জন্য আমেরিকার পাঠানো টন কে টন হলুদ মটর, আর অন্যটিতে বোঝাই করা হয়েছে তার চাইতেও বেশী পরিমাণে টাটকা মাছ যার গন্তব্য ইয়োরোপীয়ান ইউনিয়ন। মাছটির নাম নাইল পার্চ।

কে না জানে যে ভালবাসা জিনিষটি অণির্বাণ, অদম্য এবং অপ্রতিরোধ্য? লেক ভিক্টোরিয়ার চমৎকার জৈববৈচিত্র্যের কারণে পশ্চিমা কর্তারা এটিকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেন, এবং সিদ্ধান্ত নেন সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ইয়োরোপের ঘরে ঘরে পৌছে দিতে হবে। অতএব ‘আধুনিক’ বিশ্বের যা মাধ্যম বললে মাধ্যম, হাতিয়ার বললে হাতিয়ার, সার্বজনীন ভাষা বললে তাইই - অর্থাৎ অর্থনৈতিক /ব্যাবসায়িক আদানপ্রদান - তার মাধ্যমেই অদম্য সেই ভালবাসার কাজটি সম্পাদন করতে এগিয়ে আসেন মহামান্যগণ। লেক ভিক্টোরিয়ায় ছাড়া হয় নাইল পার্চ নামের মৎস্য প্রজাতির আপাতনীরিহ এক প্রতিনিধি। এবং শুরু হয় দূঃস্বপ্নের দ্বিধাহীন প্রহর।

অবাক হচ্ছেন তো? বলছি। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া, ওই জৈব পরিবেশে প্রকৃতির স্বাভাবিক বিবর্তনের বিরুদ্ধাচারণ করে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে আরোপ করা নাইল পার্চ এই বিশাল হ্রদটির শতাধিকেরও বেশী স্থানীয় মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত করে ফেলে, এবং করে খুব তাড়াতাড়িই। তবে হ্যা, নাইল পার্চ অকৃতজ্ঞ নয়। একইসাথে তার যা কাজ তাও সে করেছে অর্থাৎ ভয়ংকর হারে বংশবৃদ্ধি করে উদ্যোক্তাদের লাভের হিসেব অমলিন রেখেছে। নাইল পার্চ আবার ইয়োরোপীয় বাজারে চলে ভালো কিনা। তবে এতে করে যে লক্ষ লক্ষ আফ্রিকাবাসীরা যারা তাদের জীবনধারনের জন্য ওইসব বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মাছের ওপর নির্ভর করতো - আহরিক এবং ব্যাবসায়িক দু’কারণেই - তারা যে অনাহার নামক একটু, সামান্য একটু অসুবিধেয় পড়েছে সেটা কে collateral damage হিসেবে ধরে নিলেই কিন্তু আর কোন ঝামেলা থাকে না, এতো প্রামাণ্য চিত্র ফিত্র বানানোরও কোন ব্যাপার আসে না।

তবে দুঃখের কথা কি আর বলবো - দূঃস্বপ্নটি আবার বহুমাত্রিক। সমস্ত মাছ ইয়োরোপে রপ্তানী হয়ে যাওয়ায়, আবার পূর্বে-প্রাপ্ত মৎস্য সকল ভূতপূর্ব হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় লোকজন যে শুধু ফেলে দেয়া পচা গলা মাছ খেয়ে রোগে শোকে মরছে তাই তো নয়, গল্প আরো আছে। ‘সর্বঘটে কাঁঠালী কলা’ মানে হলো গিয়ে খামোখা সবকিছুতে নাক গলানো সপার ওই দুই উড়োজাহাজের চালকদের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে বসেন - উদ্দেশ্য কিছু পেটের কথা বের করা আর কি। তাতেই জানতে পান যে, যে উড়ানটি এসেছে উদ্বাস্তদের মধ্যে রসদ বিতরণ নামক মানবহিতকর কাজটি করতে সেই একই উড়োজাহাজ বয়ে নিয়ে এসেছে অসংখ্য অস্ত্র শস্ত্র। যে উদ্বাস্তদের জন্য কষ্ট করে জ্বালানী পুড়িয়ে খাবার আনা হয়েছে তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য, তারাই যেন আবার কাল সকালেই গোলাবারুদের সামনে বাঁচিয়ে রাখা পৈতৃক প্রাণটি নির্বিঘ্নে খোয়াতে পারে সেই কারণে কঙ্গো এবং রোয়ান্ডার হাতে জোগান দেয়া হচ্ছে ওই সব অস্ত্র! আহা ব্যাবসা হলো গিয়ে ব্যাবসা, এতে সবকিছু নিয়ে এতো মাথা ঘামালে কি চলে?

পূর্ব কঙ্গোর শুধু একদিনের যুদ্ধে প্রাণ হারায় ১১ই সেপ্টেম্বরে মোট যতজন প্রাণ হারিয়েছে ততজন করে।এই অশ্লীল বাস্তবতাকে আক্ষরিক অর্থেই বড় মাপের একটি প্র্যাকটিকাল জোক বললে কি ভুল বলা হবে?

তানযানিয়ার সরকার এই প্রামাণ্যচিত্রটির ঘোরতর নিন্দা করেছেন। তাদের মতে আফ্রিকাবাসীরা মোটেই এভাবে ভাবেন না! বিভিন্ন জায়গায় এর প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয়া হয়েছ এমন পক্ষপাতদুষ্ট, ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী ছবি দেখে জনগণের কোমলমতি মনে যাতে আঘাত লাগতে না পারে। সরকার এমনকি ‘আসল সত্য’ উদঘাটনের জন্য একটি কমিটিও গঠন করেছেন। কমিটি নিজে বা যাদের নিয়ে কমিটির কাজ তারা যদি তদ্দিন বেঁচেবর্তে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই একদিন ‘আসল সত্যটি’ জানা যাবে - চলুন ততদিন নাহয় আরেকটু ধৈর্য্য ধরি।

উন্নয়ন নামক যজ্ঞশালাটিতে অংশ নেয়ার জন্য তৃতীয়বিশ্বের বহু দেশ রপ্তানী নির্ভর শিল্পায়ননীতি অধিগ্রহন করেছে - কখনও স্বেচ্ছায় কখনও বিশ্ব ব্যাংক আর আই এম এফ এর অনুদান পাওয়ার শর্ত হিসেবে। তার ফলে কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন যেমন হয়েছে তেমনি স্থানীয় প্রথাগত শিল্প এবং অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক অনেক বেশী। আয় বৈষম্য আর সামাজিক মেরুকরণের কথা নাহয় আর নাই বললাম - সেতো একেবারে চাক্ষুষ। আবার উন্নয়নের alter ego বিশ্বায়নের ফলে যে মাকড়সার জালের মত আঠালো জিনিষটিতে আমরা সবাই আটকানো তাতে করে আমার পাড়ায় আরেকটি starbucks খুললে হয়ত সিলেটের চা বাগানে মজুরদের মাসকাবারী চালের থলিটি আরেকটু হাল্কা হয়ে যায়।

তাই বলছিলাম - গল্পটি ঠিক বাংলাদেশের নয়, আবার নয়ও কি?

কার্ল মার্ক্স , আর তাঁর তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করে গত দু’দশকে ‘উত্তর’ উন্নয়ন (postdevelopmentalism) নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন যাঁরা তাঁদের পুরোধা - আর্তূরো এস্কোবার, সেই দুজনের অনস্বীকার্য অবদান মনে করে মার্ক্সের জন্মদিনে এই লেখাটি।

3টি মন্তব্য

অশনি সংকেত (৩) - বাজারে চালের দাম ১,০০০ ডলার পেরুলো

তারিখ April 18th, 2008
ব্লগার সুবিনয় মুস্তফী বিষয় কৃষি, ক্ষুধা, খাদ্য, চাল, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, বিশ্ববাজার, মূল্যস্ফীতি

গত সপ্তাহে এই অসাধ্য সাধন হয়েছে। বিশ্ব বাজারে চালের দামের মূল সূচক (বেঞ্চমার্ক) হিসেবে থাইল্যান্ডের চালকে ধরা হয়। সেই থাই চালের দাম টন প্রতি হাজার ডলার অতিক্রম করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সমস্যা আরো বেড়েছে কারন কম পক্ষে পাঁচটি চাল রপ্তানীকারক দেশ - চীন, ভারত, কম্বোডিয়া, মিশর এবং ভিয়েতনাম - তাদের চাল রপ্তানীর উপর বিভিন্ন রকম বিধি-নিষেধ আরোপ করে দিয়েছে। এমতাবস্থায় আমদানীকারক দেশগুলোর মধ্যে panic buying এর নিশ্চিত লক্ষণ দেখা যাচ্ছে!

যে কোনভাবে হোক, পর্যাপ্ত চালের সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায় এই ক্রেতা দেশগুলো। কিন্তু তাতেও ফল হচ্ছে না। ফিলিপিন ও বাংলাদেশের নাম এসেছে এই সূত্র ধরে। ফিলিপিন যতখানি চাল কিনতে চেয়েছিল, ততখানি কিনতে পারেনি। আর ফিনানশিয়াল টাইমস জানিয়েছে যে গত সপ্তাহের আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ একেবারে কোন চাল কিনতেই ব্যর্থ হয়েছে। এরকম সব দেশই এখন তাদের চালের মজুদ বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট। এই পরিস্থিতিতে চালের দাম আদৌ কিভাবে নামবে, তা পরিষ্কার নয়।

ব্যাংককের একজন শীর্ষস্থানীয় চাল রপ্তানীকারক ব্যবসায়ী ভিচাই স্রিপাসার্ট কি বলেছেন শুনুন - “It is panic. My customers are demanding double the usual volume. We would not have enough supplies for all the demand we are facing.” এই দিশেহারা ক্রেতাদের মধ্যে অনেক বিদেশী সরকারও অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশ ছাড়াও অন্যান্য দেশে গণ-অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপ হাইতি এবং আফ্রিকার পশ্চিম তীরে অবস্থিত আইভরি কোস্টে দাঙ্গার খবর পাওয়া গেছে।

*

এই থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? কিছু কিছু ভাষ্যকারের মতে চালের দাম আর খুব বেশী বাড়বে না। উপরোক্ত FT রিপোর্টে হংকং-এর এক পাইকারী চাল ব্যবসায়ী এই আশাই ব্যক্ত করেছেন। আপাতত কোন বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশংকা নেই, তাই সামনে যে সব ফলন আসছে, সে সব নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হবে, এমনটা আশা করা যায়।

কিন্তু এই বিশ্লেষণের সাথে সবাই একমত নন। ব